বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার, আইন ও সামাজিক বাস্তবতা
যৌনতা এবং যৌন পরিচয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার কাঠামোর মধ্যে ধর্মীয় অন্ধ আনুগত্য, অশিক্ষা-কুশিক্ষা এবং অজ্ঞতার চর্চা বহু পুরনো। কিন্তু সারা বিশ্বে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকারকে দেখা হয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে। নিজস্ব যৌন পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা একজন মানুষের অধিকার। এবং এই অধিকার লঙ্ঘিত হলে একজন মানুষের মানবাধিকারেরও বিচ্যুতি ঘটে।
বাংলাদেশের আইন, সামাজিক ও পারিবারিক কোন কাঠামোতেই ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষেরা সুরক্ষিত নয়। ধর্মীয় উগ্রবাদ, মৌলবাদ এবং চরমপন্থা—ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমকামী, উভকামী ও ট্রান্সজেন্ডারসহ লিঙ্গ পরিচয়ের এই ভিন্নতাকে দেখা হয় বিকৃতভাবে।
মানুষের স্বাধীনতা আছে মানুষকে ভালোবাসার। সে ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈচিত্র্য কোনো বাধা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আইন, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং প্রথাগত ধর্মীয় মূল্যবোধ—এই তিনটি স্তর বাস্তবতার এমন একটি চিত্র উপস্থাপন করে, যা এলজিবিটিকিউ+ ব্যক্তিদের জন্য নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করা প্রায়ই নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার একটি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
আইনগত কাঠামোর ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা ঐতিহাসিকভাবে সমলিঙ্গের কিছু ধরনের সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে। এই আইন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারের সঙ্গে একটি সাংঘর্ষিক কাঠামো দাঁড় করায়, যা এলজিবিটিকিউ+ গোষ্ঠীর মানুষকে এক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে।
এমন লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষদের অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং পরিচয় প্রকাশ—যে ধরনের ঝুঁকির বাস্তবতা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান, তা একটি বহুমুখী বাস্তবতা। যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, ধর্মের অন্তরালে মৌলবাদীদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতা, মানবাধিকার নীতি এবং ক্ষমতার কাঠামোর সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
এমনকি বাংলাদেশের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ট্রান্সজেন্ডার কোটা বাতিলের দাবিতে সরব হতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা ট্রান্সজেন্ডারকে একটি বিতর্কিত শব্দ বলে আখ্যা দেয় এবং ধর্মীয় মৌলবাদীদের স্বরে বলে, ট্রান্সজেন্ডারের মতো বিতর্কিত শব্দ সারাদেশে জোরপূর্বক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভালোবাসা কি মানুষের অধিকার নয়?
ভালোবাসার কোনো সীমারেখা হতে পারে না। একজন ছেলে একজন ছেলেকে, একজন মেয়ে আরেকজন মেয়েকে ভালোবাসতেই পারে। যৌনতা মানুষের অধিকার। এটিকে শুধুমাত্র ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি ও রাষ্ট্রের আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা এক ধরনের মানবাধিকারবিরোধী কাজ।
সর্বশেষ, একটি দেশ ঘানা এলজিবিটিকিউ কার্যক্রমের প্রচার নিষিদ্ধ করে সংসদে বিল পাস করে। এবং এই আইনে বলা হয়, যারা এলজিবিটিকিউ কার্যকলাপের প্রচার করবে, তাদের তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, যা স্পষ্টভাবে মানুষের যৌন স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
