মঙ্গলবার, ২৮ জুলা, ২০২৬

পর্দা প্রথা ও নারীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস

পর্দা প্রথার নামে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন প্রত্যক্ষ করেছে আফগানিস্তানের নারীরা। এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা।

১৯৯৬ সালে তালেবানরা যখন প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন তারা ‘শরিয়াহ’ আইনের দোহাই দিয়ে নারীদের জন্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা সুনির্দিষ্ট ‘চাদরি’ বা ‘আফগান বোরকা’ পরা বাধ্যতামূলক করে।

একই রকম ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতার প্যারালালে অবস্থান করছে। জাতীয় সংসদে অবস্থান করছে বিরোধী দলের ভূমিকায়।

এবার আসি তালেবানী যুগে। যদি কোনো নারী ভুলবশত তার বোরকা দিয়ে মুখ পুরোপুরি না ঢেকে বের হতো, বা তার গোড়ালি দেখা যেত, তবে তালেবানদের ‘ধর্মীয় পুলিশ’ (Department ফর দ্য প্রমোশন অফ ভার্চু অ্যান্ড প্রিভেনশন অফ ভাইস) প্রকাশ্য রাস্তায় সেই নারীদের লোহার রড বা চামড়ার চাবুক দিয়ে নৃশংসভাবে প্রহার করত। নারীদের শিক্ষা ও চাকরি কেড়ে নিয়ে তাদের স্রেফ ঘরের ভেতরের একটি অদৃশ্য বস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল এই বোরকার আড়ালে।

১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানি নারীদের ওপর বাধ্যতামূলক ‘হিজাব’ আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়। যে নারীরা এর আগে আধুনিক পোশাকে স্বাধীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন, তাদের রাতারাতি কালো কাপড়ে শরীর ঢাকতে বাধ্য করা হয়।

এই পর্দা প্রথার আইনি ভয়াবহতা আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও বিশ্ব ভুলে যায়নি।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ২২ বছর বয়সী তরুণী মাহসা আমিনীকে ইরানের ‘নীতি পুলিশ’ (Gasht-e Ershad) গ্রেপ্তার করে স্রেফ এই কারণে যে—তার মাথার হিজাবটি সম্পূর্ণ নিখুঁত ছিল না এবং সামান্য কিছু চুল দেখা যাচ্ছিল। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের ফলে মাহসার মৃত্যু হয়, যা পুরো ইরানে এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। একটি কাপড়ের টুকরো ঠিকমতো না পরার অপরাধে একটি রাষ্ট্র তার নিজের দেশের তরুণীকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে—এর চেয়ে বড় বর্বরতা আর কী হতে পারে?

এই প্রশ্নটাই শেষ পর্যন্ত আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মানবাধিকারের মৌলিক জায়গায়—যেখানে কোনো রাষ্ট্র, কোনো আইন বা কোনো ধর্মীয় আদর্শই নারীর শরীর, পোশাক বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে দমন করার বৈধতা পেতে পারে না।  নিয়ন্ত্রণের ভাষা যতই ধর্মীয় বা নৈতিকতার নামে উপস্থাপিত হোক না কেন, তা যখন জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি আর বিশ্বাসের বিষয় থাকে না—পরিণত হয় ক্ষমতার নির্মম প্রয়োগে। এবং নারীরা রুখে দাঁড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *